পর্ব ৩: ফোকাস

উচ্চমাধ্যমিকে পড়াশোনার কয়েকটা বিশেষ দিক আছে, যার প্রতি খেয়াল না রাখলে পরবর্তী পড়াশোনার ক্ষেত্রে আশা-নিরাশার খেলার মধ্যে পড়ে যাওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা।

প্রথম, ফোকাস;
দ্বিতীয়, প্ল্যানিং;
তৃতীয়, টাইম ম্যানেজমেন্ট;
চতুর্থ, রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট;
পঞ্চম, কন্টিনিউয়াস ফিডব্যাক;
ষষ্ঠ, কানেকশন;

যাঁরা কর্পোরেট সেক্টরে আছেন তাঁরা এই শব্দগুলোর সঙ্গে অতিপরিচিত, এটা তাঁদের দৈনন্দিন শব্দভাণ্ডারের মধ্যে পড়ে; কিন্তু শিক্ষাজগতের, বিশেষ করে মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিক স্তরের পড়ুয়াদের কাছে এই শব্দগুলো হিব্রু-ল্যাটিন !

কেন এই নতুন জিনিসগুলো দরকার ?

কারণ তিনখানা।

১) কম্পিটিশন খুব বেশী বেড়ে গেছে। আজ থেকে ২১ বছর আগে আমি যখন উচ্চমাধ্যমিক দিয়েছিলাম মোট পরীক্ষার্থী ছিল ৩ লাখের কাছাকাছি, আজ সেটা প্রায় ১২ লাখের কাছাকাছি। ২০০০ সালে “কিছু একটা ঠিক” হয়ে যাওয়ার প্রবাবিলিটি অনেক বেশী ছিল আজকের তুলনায়, আজ “বাই চান্স কিছু” হয়ে যাওয়া খুব মুশকিল।

২) ডাক্তারি এবং ইঞ্জিনিয়ারিং ছাড়াও আজ শত শত কেরিয়ার খুলে গেছে, ইন্টারনেটের দৌলতে সেগুলি সম্বন্ধে জানা, পরীক্ষা দেওয়া, প্রস্তুতি নেওয়া আজ জলভাত। তাদের অনেকেরই রোজগার ডাক্তারি এবং ইঞ্জিনিয়ারিং এর সমতুল্য, বা বেশি।

৩) জীবন অনিশ্চিত, করোনার পরে তো আরোই – কখন কোন জিনিস কিভাবে পাল্টে যাবে কেউ জানে না (যেমন এবারে নাইনের নম্বরের ভিত্তিতে মাধ্যমিকের রেজাল্ট)।

এই ছয়খানা স্কিল যদি একজন আয়ত্ত করে নেয়, প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও সে মাথা ঠাণ্ডা রেখে তুফান সামলে নেবে।

রোজ একটা করে টপিক নিয়ে আলোচনা করবো, বিশেষ করে একজন উচ্চমাধ্যমিক পড়ুয়া কিভাবে এইগুলো ডেভেলপ করতে পারে।

ফোকাস

“উচ্চমাধ্যমিকের পর কি নিয়ে পড়বে?”

“যেটা নিয়ে পড়বে বলে ঠিক করেছো, সেটায় চান্স না পেলে কি নিয়ে পড়বে?”

প্রাথমিকভাবে এই দুই প্রশ্নের অতি সুস্পষ্ট এবং নির্দিষ্ট উত্তর দেওয়াই হলো ফোকাস।

সাধারণত আমরা যে উত্তর শুনি – “ওই, জয়েন্ট দেবো; দেখি, ডাক্তারি না ইঞ্জিনিয়ারিং কোনটা পাই! না পেলে, অনার্স নেবো, কিসে নেবো – দেখি, রেজাল্ট কিরকম হয়, ওই সায়েন্স গ্রুপের কিছু একটাতে নেবো।” সম্পূর্ণ আউট অফ ফোকাস !!

কোনো কোর্স কেন পড়বো, সেটা কোথায় কোথায় পড়া হয়, পড়ার খরচ কতো, পড়ার পরে কোথায় কোথায় কতো মাইনের চাকরি হয় – এই সমস্ত তথ্য জানা আজ জলভাত ইন্টারনেটের দৌলতে, এই তথ্যগুলোর ভিত্তিতে উপরের দুটো প্রশ্নের সুস্পষ্ট উত্তর পড়ুয়ার মনে থাকা জরুরী, তবেই তার প্রস্তুতি ঠিকঠাক হবে।

কিছুদিন আগে এক নিম্নবিত্ত পরিবারের পড়ুয়ার সাথে কথা হচ্ছিল, সে ২০২০ এর মাধ্যমিকে যথেষ্ট ভালো নম্বর পেয়েছে, তার ইচ্ছে ডাক্তার হবার – কেন ? মানুষের সেবা করবার জন্য।

নিঃসন্দেহে খুব ভালো আদর্শ; তাকে পরবর্তী প্রশ্ন করলাম – যদি তুমি সরকারী মেডিক্যাল কলেজে চান্স না পাও, তাহলে কি করবে ? প্রাইভেট মেডিক্যাল কলেজে পড়ার সংস্থান কিভাবে জোগাড় করবে ? কোথা থেকে স্কলারশিপ পাবে ? লোন নিতে পারবে ?

উত্তর নাই, না তার কাছে, না তার অভিভাবকের কাছে।

আবার প্রশ্ন করলাম – মানুষের সেবাই যদি উদ্দেশ্য হয়, হোমিওপ্যাথি নিয়ে পড়বে না কেন ? সেও তো এক চিকিৎসাপদ্ধতি।

তারও উত্তর নাই।

আমার আদর্শ খুব ভালো, এবং আমার রেজাল্ট খুব ভালো – কেবল এই দুইয়ের ভিত্তিতে অন্ততঃ আজকের দিনে কেরিয়ার গড়তে গেলে আশাভঙ্গের সম্ভাবনা খুব বেশি।

অবশ্যই এই ফোকাস তৈরীর কাজে অভিভাবকের ভূমিকা খুব, খুব গুরুত্বপূর্ণ; কারণ শেষমেশ দেখতে গেলে, সব আর্থিক দায়িত্ব তাঁরই।

“উচ্চমাধ্যমিকের পরে কি পড়বো” – এর ভিত্তিতেই উচ্চমাধ্যমিকের পড়ার সিলেবাস নির্ভর করে। কারণ, উচ্চমাধ্যমিক মানে শুধু “উচ্চমাধ্যমিক এবং রেজাল্ট” নয়, প্লাস আরো আরো পরীক্ষা, প্লাস আরো আরো কাউন্সেলিং, প্লাস আরো আরো এডমিশনের জন্য দৌড়াদৌড়ি, এক লম্বা যাত্রা….জংশন স্টেশন কিনা ! সদাব্যস্ত !!

উচ্চমাধ্যমিকের একজন পড়ুয়া তার অভিভাবকের সঙ্গে বসে ঠিক কিভাবে নিজের ফোকাস ঠিক করবে, তার একটা লম্বা চেকলিস্ট আছে, প্রশ্নোত্তর ফর্মে। সেটা দিয়ে দৈর্ঘ্য বাড়াতে চাই না – কারুর প্রয়োজনে অবশ্যই পাঠিয়ে দেবো।

তবে মোদ্দা কথা এইটা বোঝা,

“উচ্চমাধ্যমিক মানে শুধু “উচ্চমাধ্যমিক এবং রেজাল্ট” নয়, প্লাস আরো আরো পরীক্ষা, প্লাস আরো আরো কাউন্সেলিং, প্লাস আরো আরো এডমিশনের জন্য দৌড়াদৌড়ি, এক লম্বা যাত্রা….জংশন স্টেশন কিনা ! সদাব্যস্ত !!”

ফোকাস ঠিক না থাকলে ট্রেন কোন লাইন চলে যাবে, বা সঠিক লাইনে গেলেও পুরো স্পিডে চলবে কি না তার গ্যারান্টি নাই !

আগামীকাল “প্ল্যানিং”।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x